কর্ণফুলী টানেল

লোকসান এড়িয়ে বেসরকারি ড্রাই ডক ঘিরে লাভের আশা সেতু বিভাগের

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম টানেল ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু করা হয়।

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম টানেল ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু করা হয়। কিন্তু প্রাক্কলন অনুযায়ী, পর্যাপ্ত যানবাহন চলাচল না করায় এ টানেলের দৈনিক ব্যয়ের মাত্র এক-চতুর্থাংশ টোল আদায় হচ্ছিল। সম্প্রতি কর্ণফুলী নদীর অন্য প্রান্তে স্থাপিত একটি বেসরকারি ড্রাই ডকের কল্যাণে লোকসান এড়িয়ে লাভের সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)।

বিবিএ সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে কর্ণফুলী নদীর অন্য প্রান্তে বেসরকারি পর্যায়ে একটি ড্রাই ডক স্থাপন করা হয়। আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত কর্ণফুলী ড্রাই ডক স্পেশাল ইকোনমিক জোনের এ জেটিগুলোয় বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পণ্য খালাস শুরু হয়েছে, যা কর্ণফুলী টানেল দিয়ে চট্টগ্রাম শহর হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরাসরি পরিবহন করা হচ্ছে। এ কারণে টানেলের আয় কয়েক মাসের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ লাখ টাকা করে বেড়েছে। এ ড্রাই ডকে ছয়টি জেটি থাকলেও বর্তমানে দুটি চালু রয়েছে। বাকি চারটি চালু হলে কর্ণফুলী টানেলের দৈনিক আয় লোকসান ছাড়িয়ে লাভের ধারায় ফিরতে পারে বলে জানিয়েছে টানেল কর্তৃপক্ষ।

চীনা ঋণ ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে নির্মিত কর্ণফুলী টানেলের মূল দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। পরে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে চীনা এক্সিম ব্যাংক। শুরুতে প্রতিদিন ২৫ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচলের প্রাক্কলন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা চার হাজারেরও কম। ফলে টানেল কর্তৃপক্ষকে প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হয়।

কর্ণফুলী টানেলের মাসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, মার্চে মোট ৯২ হাজার ৪৯৫টি যানবাহন চলাচল করেছে। বিপরীতে আয় হয়েছে ২ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার ২০০ টাকা। তবে পরবর্তী মাস থেকে যানবাহন চলাচল ও টোল আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যায়। এপ্রিলে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫২ যানবাহনের বিপরীতে ৩ কোটি ৬০ লাখ ৪৭ হাজার ৫০ টাকা, মে মাসে ১ লাখ ৭ হাজার ৩৬৯ যানবাহনের বিপরীতে ৩ কোটি ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫০ টাকা, জুনে ১ লাখ ২৭ হাজার ৪২১ যানবাহনের বিপরীতে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা, জুলাইয়ে ১ লাখ ১৫ হাজার ১১৪ যানবাহনের বিপরীতে ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫০ টাকা এবং আগস্টে ১ লাখ ৯৮১টি যানবাহনের বিপরীতে টোল আদায় হয়েছে ৩ কোটি ৬১ লাখ ৯৪ হাজার ৫০ টাকা। প্রতি মাসেই যানবাহন চলাচলের হার ও ভারী যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় টোল আদায় আরো বাড়বে বলে আশা করছে টানেল কর্তৃপক্ষ।  

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত কর্ণফুলী ড্রাই ডকে একসঙ্গে আটটি বৃহৎ আকারের জাহাজ ভিড়তে পারবে। চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ মিটার ড্রাফটের নিচে থাকা জাহাজগুলো ভিড়তে সক্ষম হলেও বেসরকারি এ জেটিতে ভিড়তে পারবে ১১ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ। ছোট জাহাজে ১২০০-১৫০০ কনটেইনার প্রবেশ করতে পারলেও এ জেটিতে চার থেকে সাড়ে ৪ হাজার কনটেইনার নিয়ে জাহাজ ভিড়তে পারবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে আমদানি ব্যয় অনেকাংশে কমে যাবে। তাছাড়া গভীর সমুদ্রের পরিবর্তে ড্রাই ডকের জেটিতে বাল্ক পণ্য খালাস করলে প্রতি টনে অন্তত ৫০০-৬০০ টাকা খরচ কমবে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির। এ ড্রাই ডকে দৈনিক ছয় হাজার টন ও মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টন পণ্য খালাস করা যাবে বলেও জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

টানেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের পর তা শহরের ভেতর দিয়ে সারা দেশে চলে যায়। কিন্তু কর্ণফুলী ড্রাই ডকে পণ্য খালাস হলে সেটি টানেলে প্রবেশ করে মেরিন ড্রাইভ রোড হয়ে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলে যাবে। ফলে যানজট এড়িয়ে দ্রুত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত হবে।

কর্ণফুলী টানেল কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কর্ণফুলী নদীর অন্য প্রান্তে বেসরকারি একটি ড্রাই ডকে আমদানি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম শুরু হওয়ায় টানেলে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় ৪-৫ লাখ টাকা বাড়তি আয় হচ্ছে।’ ড্রাই ডকের বাকি চারটি জেটি চালু হলে ব্যয় ছাড়িয়ে কর্ণফুলী টানেল অচিরেই লাভের ধারায় ফিরবে বলে আশা করছেন তিনি।

জানা গেছে, কর্ণফুলী ড্রাই ডকে পণ্য খালাস কার্যক্রম শুরুর পর টানেলে যানবাহন চলাচল বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে গত মে মাসে নৌ-পরিবহরন মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠি পাঠায় সেতু কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে বেসরকারি ড্রাই ডক কর্তৃপক্ষের চুক্তির মাধ্যমে আমদানি পণ্যের জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম বৃদ্ধি ও অসমাপ্ত জেটিগুলোর কার্যক্রম শুরু করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় সেতু কর্তৃপক্ষ। এদিকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এ বিষয়ে তাগাদা দিতে সেতু কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে টানেল কর্তৃপক্ষ।

টানেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগে টানেল পরিচালনায় প্রতিদিন ব্যয় হতো ৩৭ লাখ টাকারও বেশি। যানবাহনের চলাচল কম থাকায় আয় হতো মাত্র ৯-১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ টানেল পরিচালনা করে সেতু বিভাগের দৈনিক লোকসান হতো ২৬-২৭ লাখ টাকা। তবে কয়েক মাস ধরে কর্ণফুলী ড্রাই ডকে বেশকিছু জাহাজ থেকে পণ্য খালাস শুরু হওয়ায় টানেলে যানবাহনের আধিক্য বেড়ে গেছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন চলাচল বেড়ে যাওয়ায় টোল আদায়ের হারও বেড়েছে। আগে প্রতিদিন গড়ে ৯-১০ লাখ টাকা আয় হলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪-১৫ লাখ টাকায়।

কর্ণফুলী ড্রাই ডক স্পেশাল ইকোনমিক জোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি বছর শতাধিক জাহাজ আমাদের দুটি জেটিতে পণ্য খালাস করেছে। বন্দরের সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে বিএসআরএম, আবুল খায়ের গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পণ্য খালাস করতে চায়। আমরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্দরের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে আমাদের জেটিগুলোয় পুরোদমে পণ্য খালাস কার্যক্রম শুরু হবে।’

আরও